Monday, February 1, 2010

মেঘনা


"চলে এস, জয়ন্ত! ও’খানটায়ে সিঁড়িগুল একটু স্লিপারী। ও’টুকু ক্লাইম্ব করে চলে এস।” – অনেকটা উপর থেকে মেঘনার গলা শোনা গেল| জয়ন্তর নাকের ডগায়ে চশমাটা একটু ঢিলে হয়ে এসছিল। সেটাকে আ্যডজাস্ট করে, ক্যামেরার ব্যাগটা ঠিক করে নিতে একটু সময় লাগছিল। মেঘনা রক-ক্লাইম্বিং জানা মেয়ে। তরতরিয়ে অনেকটা উপরে উঠে গেছে। “একটু অধৈর্য্য টাইপ্‌; এতটুকু দেরী সৈছে না!” জয়ন্ত উপর দিকে একবার তাকিয়ে, মনে মনে ভাবল।

বিকেলের সোনালী রোদে জায়গাটা সত্যিই বেশ সুন্দর দেখাচ্ছে। গাঢ় নীল আকাশে দু একটা ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘ ঘুরে বেড়াচ্ছে। পাহাড়ের গায়ে মানুষের হাতে কাটা থাক্‌ থাক্‌ সিঁড়ি, টেরেস্‌। অজস্র ছড়ানছেটানো পাথর। পরিত্যক্ত বাড়িঘরের ধ্বংসাবশেষ। এই তাহলে ছোটবেলায়ে বইয়ে পড়া মাচু পিচু! কি করে জানি শহরটা ইউরোপীয় লুটেরাদের নজর এড়িয়ে গেছিল। কিন্তু আজকের দিনে এই দেখতেই হাজারহাজার পর্যটক পেরুতে ভীড় করে। জয়ন্তর একাএকা এতটা দূরে অপরিচিত দেশে হঠাৎ বেড়াতে আসা নিয়ে বন্ধুবান্ধব, কলীগরা অল্প হলেও ভুরু কুঁচকিয়েছিল। জয়ন্ত বিশাল কিছু রিস্ক নেওয়ার মত ছেলে না। আর পাঁচটা বুর্জোয়া বাঙ্গালী ছেলের মতই পড়াশোনা করে ভালো চাকড়ি করতে চাওয়া পাব্লিক। সেইসমস্ত ছোটবেলায়ে আয়ত্ত করা ভদ্রলোক ধ্যান-ধারণা নিয়েই মার্কিন মুলুকে Phd করতে এসছে। কিন্তু এম.এন.রায়, সুরেশ বিশ্বাস, শরৎ দাশের মত লোকেরা তো ভদ্রলোক সিস্টেমেরই প্রোডাক্ট!(“বিকজ় অফ” না “ডেস্পাইট দ্যা” সিস্টেম, সেটা অবশ্য অন্য কথা।)

মেঘনার সাথে মোলাকাতটা একটু অদ্ভুত ভাবে হয়। পেরুর রাজধানী লীমা থেকে মুখ্য পর্যটন কেন্দ্র কুস্কো অনেকটা পথ। আন্দিস পাহাড়ের অনেকগুল শ্রেণী পেরিয়ে সর্পিল পাহাড়ি রাস্তা। বহু টুরিস্টই এই দুরুত্বটা প্লেনে মেরে দেন। কিন্তু জয়ন্ত এখনো ছাত্র। টাকা বাঁচিয়ে বাসে ট্রাভেল করে, সস্তার জায়গায়ে থেকে খেয়ে চালিয়ে দেওয়াটাই প্ল্যান। সেইমত গাইডবই দেখে একটা যে কোন ইউথ-হস্টেল বা ডর্মে ঢুকে গেছিল। দশ ঘন্টা ফ্লাইটের পর কুড়ি ঘন্টা টানা বাস্‌ জার্নি করে জয়ন্ত তখন ধুঁকছে। ব্যাবস্থা বলতে একটা বড় ঘরে দশটা ট্রেনের বাঙ্কের মত সাজানো বেড। তার মধ্যে একটিতে সে। ঘরে তখন দুটো আর্জেন্তিনিয় ছেলে -নিজেদের মধ্যে স্প্যানিশে কিসব বকে চলেছে। জয়ন্ত দু’একবার আলাপ জমানোর চেষ্টা করে ছেড়ে দিয়েছে। একবার মারাদোনা আর একবার ফকল্যান্ড যুদ্ধের প্রসংগ এনেও ওদের থেকে বিশেষ কোন রিয়্যাক্সন পাওয়া গেলনা। ওরা ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরাজীতে জানিয়ে দিল যে ওসব পুরন কাসন্দি ঘাঁটার ওদের বিশেষ সখ নেই আর তা ছাড়া মারাদোনা আগে প্লেয়ার হিসেবে যতই ভগবান হয়ে থাকুন না কেন, তার পর যা করেছেন তার জন্য বোকা জুনিয়র্‌স সাপোর্টার ছাড়া এম্নিতে সবার কাছেই ভিলেইন! ছেলে দুটর ঘোলাটে চোখের দৃষ্টি আর কথা বলার ধরণ দেখে মনে হল হাইলি ড্রাগ-অ্যাডিক্ট হতে পারে। কিছুক্ষণ পর এক জোরা মার্কিন যুবক-যুবতী ঘরে ঢুকল। তারা যে মিনিট দশেক ছিল, নিজেদের জরাজরি করা আর চুমু খাওয়াতেই ব্যাস্ত ছিল। তারপর হঠাৎ করে – “Hey, we’re going to go clubbing…anybody care to join us?!” বলে উত্তরের অপেক্ষা না করেই বেরিয়ে গেল। অন্য একটা বিছানা তে জিনিসপত্র রাখা কিন্তু মালিক কে এখনও দেখা যাচ্ছে না। বাকি বেড গুল খালিই মনে হল।
................
(To be continued)

জয়ন্ত ভাবল এদের বিশেষ পাত্তা না দিয়ে ঘুমনোর চেষ্টা করাই ভাল। তবে রাস্তার অনেকটা ঘুমিয়েই এসছে। আর খুব ক্লান্ত থাকলে আবার চট করে ঘুম আসতে চায় না। তাই উত্তর পেরুর মোচে সভ্যতা সম্বন্ধে একটা ইতিহাসের বই বার করে শুয়ে শুয়ে সেটাই মন দিয়ে পড়ার চেষ্টা করল। কিছুক্ষণ পর টের পেল মাথাটা ভালই ধরেছে। হাত পায়েও কেমন চিন্‌চিন্‌ করছে। কুস্‌কোর উচ্চতা ১২,০০০ ফুট। মানে দার্জীলিং-এর প্রায় ডাবল। সে বইয়ে পড়েছিল যে এখানে অনেক পর্যটকেরি “অল্টিচিউড সিক্‌নেস” হয়। এতটা উচ্চতায়ে হঠাৎ করে এসে পরলে শরীরের অ্যাডজাস্ট করতে অসুবিধে হয়। কিছুক্ষণ শুয়ে থেকেও যখন অস্বস্তি কাটল না তখন জয়ন্ত ধরে নিল ওর সেটাই হয়েছে। হাত বারিয়ে জ্যাকেটের পকেটে অষুধ খুঁজতে গিয়ে প্রচন্ড দমে গেল সে। ওখানে এটিএম থেকে তোলা পাঁচটা কুড়ি ডলারের নোট থাকার কথা। সেটা কখন জানি হাওয়া হয়ে গেছে। লিমার বাস্‌স্ট্যান্ডে খুব ভীড় ছিল। সেখানে আবার একটা লোকের সাথে আচমকা ধাক্কা লেগেছিল। তখনই কি….? জয়ন্ত চটপট দেখে নিল ওর ওয়ালেট আর পাস্‌পোর্টটা ঠিক আছে কিনা। যাক নিশ্চিন্তি! কিন্তু তাও মেজাজ টা কিরম খিঁচড়ে গেল। জয়ন্ত আবার চোখ বুজে জোর করে ঘুমনোর চেষ্টা করতে লাগল। প্রচন্ড বিরক্ত লাগলে বাইরের পৃথীবি থেকে এরম উটপাখির মত নিজেকে সরিয়ে নেওয়াটাই সহজ সমাধান মনে হয়।

কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবার নতুন এক ফ্যাসাদ! পাশের ঘর থেকে নানারকম আওয়াজ, হল্লা শুরু হল। তার মধ্যে থেকে থেকে মদ্যপ নারীকন্ঠে চিৎকার – “kiss me, Juan!” জয়ন্ত দেখল আর্জেন্তিনীয় দুজন খ্যা খ্যা করে হাসছে। এমনিতে হয়ত ওরো হাসিই পেত কিন্তু এরম পরিস্থিতিতে প্রচন্ড বিরক্তি ছাড়া আর কিছু আসা সম্ভব নয়। তখনই লক্ষ্য করল যে কাছেই যে খাটটাতে আগে শুধু ব্যাগপত্তর রাখা দেখেছিল তার মালিক কখন জানি ফিরে এসছে। মেয়েটিকে দেখতে অনেকটা ভারতীয় টাইপের, যেমন অনেক লাতিনারা হয়। কানে আই পড জাতীয় কিছু লাগিয়ে নিজের মনে কিছু একটা পড়ছে। কখন মেয়েটিও ওর দিকে চোখ তুলে এক ঝলক ওর মুখটা দেখে নিয়ে খুব সপ্রতিভ ভাবে হেসে হাল্কা আমেরিকান অ্যাক্সেন্টেড ইংরেজীতে বল্‌লঃ “You don’t look happy at all! Here you should carry your own set.” এই বলে ব্যাগ থেকে আর একটা ওয়াকম্যান বার করে জয়ন্তর দিকে বারিয়ে দিল। জয়ন্ত হঠাৎ করে কোন অপরিচিত মানুষের থেকে সাহায্য নিতে পছন্দ করেনা – মেয়েদের ক্ষেত্রে তো সংকচটা আরো বেশি। কিন্তু বেরাতে চাইলে কিছু অভ্যাস পাল্টাতেই হয়। এবার যেটা আসল দরকার সেটাই চেয়ে বসল: “Thanks! Do you by any chance have some medicine for soroche on you? I seem to have lost the pills I was carrying.” মেয়েটি কিছুক্ষণ ভেবেই “wait” বলে প্রায় দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। জয়ন্তও ওর সাথে যাওয়ার জন্য খাট থেকে নামতে যাচ্ছিল, কিন্তু মেয়েটা ইশারায়ে বেশ জোরের সঙ্গে ওকে ওখানেই থাকতে বলে গেল। মিনিট পাঁচেক পরে ফিরল একটা গরম জল ওয়ালা ফ্লাস্ক নিয়ে। সেটা জয়ন্তকে দিয়ে একটা ছোটো প্লাস্টিকের স্যাশে জাতীয় কিছু ছুঁড়ে দিল। মুখে বল্ল : “I don’t trust chemicals. This is the real medicine.” জয়ন্ত যখন স্যাশে টা খোলার চেষ্টায়ে ব্যস্ত মেয়েটি আর এক গাল হেঁসে নিয়ে ওর সাথে বেশ গল্প জুরে দিল। "You look Indian. Which part of India?" Calcutta শুনে জয়ন্ত কে বেশ কিছুটা চমকে দিয়ে স্পষ্ট বাংলায়ে বল্ল ঃ “আরে কি মজা, আমিও বাঙ্গালী! নাম মেঘনা। বাংলাদেশে জন্ম।’’ বাংলায়ে হাল্কা টান আছে কিন্তু খুব স্পষ্ট উচ্চারণ। স্যাশেটা খুলে জয়ন্ত দেখল ভেতরে অনেক কটা টী-ব্যাগের মত দেখতে জিনিস। গায়ে লেখা : ‘‘mate de coca’’। অর্থাত coca পাতার চা। আন্দিসের আদিবাসিন্দা কেচুয়া বা আয়মারা উপজাতিয় মানুষরা অল্টিচিউড সিক্‌নেস কাটাতে কোকা পাতা ব্যাবহার করে জানা ছিল। কিন্তু পেরুতে তাকে এক বাঙ্গালী মেয়ে এ জিনিস অফার করবে এ কথা কস্মিনকালেও ভাবে নি!



সেই প্রথম দিন মেঘনার সাথে অনেকক্ষণ আলাপ চলেছিল। কথায়ে কথায়ে সে জানল যে মেঘনার বছর পাঁচ-ছয়েক বয়স থাকতেই ওর বাবা ব্যাবসাসূত্রে বাংলাদেশ ছেড়ে চলে আসেন। প্রথমে কেনিয়া, তারপরে কিছু বছর ইউ.কে তে থেকে ওরা কানাডায়ে আসেন। চারটে মহাদেশে বেড়ে ওঠা মেঘনা অনেকগুলি ভাষা ফ্লুয়েন্টলি বলতে জানে। তারপর আমেরিকার এক নামী কলেজে আন্থ্রপোলজি নিয়ে পড়েছে। কলেজে শেষ করে হঠাৎ প্রথাগত চাকড়ি বা পড়াশুনার পথ ছেড়ে দিয়ে পৃথীবি দেখতে বেরিয়েছে। এতে অবাক হওয়ার হয়তো বিশেষ কিছু ছিলনা। পশ্চিমের ধনী দেশের ছেলেমেয়েরা এরম গ্যাপ ইয়ার নিয়েই থাকে অনেকসময়। তবে বাড়ির লোক একটু সাবেকি ধরণের। তাই মেঘনাকে প্রায় বাবা মার সাথে ঝগড়া করেই বেরিয়ে পরতে হয়েছে। জয়ন্ত কিছুটা ঈর্ষান্বিত হয়ে নিজের ছকে ফেলা জীবনটার কথা ভাবল। আমেরিকায়ে আসার পর থেকেই ও লক্ষ্য করে দেখেছে যে সেখানকার ছেলেমেয়েদের জীবনটা দেখে ওর মনে হয় ও লাইফে অনেক কিছু মিস করেছে। এত সুযোগ, এত ফ্রীডম! কিন্তু অনেক জিনিস নিয়ে অস্বস্তিও হয়। সিকিউরিটি আর ফ্রীডম দুটো এক সাথে পাওয়া বোধহয় খুব শক্ত। দুয়েক ঘন্টা পর মেঘনা "কাল কাজ আছে, গুড-নাইট" বলে শুয়ে পরেছিল। কাজ মানে ট্যুর-গাইডের চাকরি। মেঘনা প্রায় মাস দুয়েক কুস্কোয়ে আছে। পয়সাকড়ি কমে যাওয়াতে কয়েকদিন স্প্যানিশ-ইংলিশ দোভাষী গাইডের চাকরি করে নিচ্ছে। যাওয়ার আগে আবার জয়ন্ত কে বলে গেল : "you should sleep too, you've had a long day." অনেক মেয়েদের মধ্যে জয়ন্ত এই প্রবণতাটা আগেও লক্ষ্য করেছে। প্রথম আলাপেই এরা এত সহজ ভাবে কন্সার্ন দেখায়ে কি করে কে যানে! কিন্তু সেটুকু ভাল না লাগারো তো উপায় নেই।

পরের দিন জয়ন্ত পায়ে হেঁটে পুরো কুস্কো শহরটা ঘুরল। জায়গাটার একটা ইউনিক্‌ ফিল আছে। সরু সরু, পাথরে বাঁধানো , উঁচুনীচু রাস্তা। ইন্‌কা আমলের অনেক কিছুই এখনো অবশিষ্ট আছে। ইন্‌কা পাথরের ভীতের উপরই মডার্ন বাড়িঘর গুল বানানো।
বিকেলের দিকে হস্টেলে ফেরার সময় মেঘনার সাথে দেখা। "কি señor, কেমন ঘুরলে? কি কি দেখলে?" - আবার একমুখ হাসি মাখা মেঘনার প্রশ্ন। জয়ন্ত দুয়েকটা মিউজ়িয়াম, ক্যাতেদ্রাল, ইন্‌কা ধ্বংশাবশেষের নাম করল। সেসব শুনে মেঘনা এক চোখ কপালে তুলে কপট শ্লেষ মেশানো গলায়ে বল্‌ল : "যাঃ, তুমি তো দেখছি blindly guidebook follow করে ঘুরছ! come with me, I will show you some real places. As a traveler you shouldn't be missing these experiences."

প্রথমেই মেঘনা ওকে একটা দেশীয় বাজারের মধ্যে এনে ফেল্‌ল। আশপাশের গ্রাম থেকে ট্র্যাডিশনাল জামাকাপড় পরে অনেক মহিলারা এসে দোকান দিয়েছেন মনে হল। জামাকাপড়, হ্যান্ডিক্রাফটসের পর্যটকদের ভীর করা দোকান গুল ছাড়িয়ে ওরা একেবারে কাঁচা সব্জী, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের বাজারে ঢুকে পরল। দেখলে ভারতের কথা মনে পরে যায়। মেঘনা বল্ল, "এখানে আমি মাঝেমাঝেই এটাসেটা কিনি। ভাল রকম দরদাম করতে হয় কিন্তু!" একটা ঠেলাগাড়ি করে এক কিশোরী কিছু একটা বিক্রী করছিল। মেঘনা আচমকা সেখানে দাঁড়িয়ে পরে মেয়েটিকে স্প্যানিশে কিসব বলে, হাত বাড়িয়ে লাল মত কিসব তুলে নিয়ে মুখে পুরে চেবাতে লাগল। "try করে দেখ। এটা fried locust. দারুণ খেতে!" ফরিং ভাজা খাওয়ার বিশেষ প্রবৃত্তি হল না জয়ন্তর। এক কাপ কোকা চা-ই চেয়ে নিল সে। এই একটা বেশ ভাল জিনিস শেখা গেছে!

(ক্রমশ)


তারপরের জায়গাটা একটা বার। জয়ন্তর মদ গিলতে কোন অসুবিধে ছিল না - যাদবপুরে পড়তে বন্ধুদের সাথে আনেক বার খেয়েছে। কিন্তু মেঘনা সার্ভিং কাউন্টারের দিকে গেলই না। উল্টদিকের টেবিলে বসা কয়েকজন ভবঘুরে টাইপ চেহারার ছেলেমেয়ের মাঝে এনে ফেল্‌ল। মেঘনা আলাপ করিয়ে দেওয়ার জন্য বল্‌ল, "meet my new friend from India- Joyonto!"
"Hello Joy", একটা ঢ্যাঙ্গা দাড়িওয়ালা শ্বেতাঙ্গ ওর দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। "I am Pete. Do you like music?" বলেই পাশে রাখা একটা গীটার তুলে নিয়ে ঝ্যাং ঝ্যাং করে বাজিয়ে দুয়েক কলি কান্ট্রী মিউজ়িক গেয়ে দিল। টেবিলে বসা অন্য্ তিনচার জনও হাসতে হাসতে হাত তালি দিল। এদের সকলের সঙ্গেই একে একে পরিচয় হল। Pete পাঁচ বছর ধরে লাতিন আমেরিকায়ে ঘুরছে। গানবাজনা আর ভ্রমণ নিয়েই থাকে। Maya ফ্রান্সের মেয়ে - social service, environmental activism এসব নিয়ে উৎসাহী - বেশ সিরিয়াস টাইপের মনে হল। Will জার্মান - তিন মাস হল পুরনো চাকরি ছেড়ে পেরুতে থেকে স্প্যানিশ শিখছে। ইচ্ছে আছে সারা south america বাইকে ঘোরার। Olga চেক্‌ - বয়ফ্রেন্ডের সাথে বেরাতে এসছিল। কিন্তু পরে ব্রেক্‌-আপ হয়ে যাওয়াতে এখন একাই পেরুতে কিছুদিন থাকবে ঠিক করেছে।

এরম একটা অদ্ভুত মিশ্র কম্পানিতে জয়ন্ত একটু অস্বস্তি বোধ করছিল। সে বরাবরই একটু লাজুক। কিন্তু একটু পরেই দেখল যে এরা এত easygoing যে কিছুক্ষণের মধ্যেই ওকেও আপন করে নিয়েছে। জয়ন্ত আবার কখন নিজের অজান্তেই ওদের নানারকম বইয়ে পড়া ইতিহাসের গল্প শোনাতে শুরু করে দিয়েছে। মায়া সভ্যতার রাজারানীরে কিভাবে নিজেদের রক্তাহূতি দিয়ে দেবতাদের খুশি রাখার চেষ্টা করত, এমনকি নিজেদের যৌনাঙ্গে সূচ বিঁধিয়েও, শুনে সবাই খুব শিহরিত। মেঘনা আবার বল্‌ল, "you say you are an engineer but you know so much cool stuff about so many things...impressive!" জয়ন্ত মনে মনে ভাবল স্কুল-লাইফে Quizzing-এর অভ্যাসটা তাহলে কিছু কাজ়ে লেগেছে! কিন্তু রাতের দিকে যখন সবাই হাত ধরাধরি করে নাচল, জয়ন্ত একটা বিয়ার নিয়ে চুপচাপ পাশে বসে রইল। Maya আবার juggling করে দেখাল। Will সারাক্ষণ মজার মজার জোক্‌স শুনিয়ে আসর জমিয়ে রাখল। মেঘ্না নিজেও কয়েকটা যোগব্যামের কসরৎ দেখাল। Olga অপূর্ব সুন্দরী। ওর সাথে নাচার জন্য লাইন পরে যাচ্ছিল। জয়ন্ত এইরকম আসর দেশে হোক কি বিদেশে খুব একটা এঞ্জয় করতে পারেনা।

(ক্রমশ)


অবশেষে জয়ন্ত হাঁফাতে হাঁফাতে চুড়ায়ে পৌঁছল। মাচু পিচুর পিছন দিকে এই পাহাড়টার নাম উয়ানা পিচু। চারিদিকের ভিউটা অপূর্ব। জয়ন্ত ছবি তোলায়ে মন দিল। মেঘনা ওর ক্যামেরায়ে ছবিগুল প্লেব্যাক করে দেখে নিয়ে বলল। "not bad! আমার এক ইতালিয়ান বন্ধু আছে, Roberto -দারুণ ছবি তোলে! তোমায় দেখাব একদিন।"
জয়ন্ত একটু শুক্‌নো গলায়ে বল্ল, " তোমার বন্ধুরা সকলেই বেশ আর্টিস্টিক না? কেউ গানবাজনা জানে তো কেউ কসরত দেখায় আবার একজন ফটোগ্রাফী জানে!"
মেঘনা সরল ভাবেই বলল, "হ্যাঁ, সেটাই বেরানোর মজা। নানারকম মজার লোকের সাথে বন্ধুত্ব হয়।"
"বিপজ্জনক, অসৎ লোকের সাথেও তো হতে পারে?"
"হ্যাঁ, তাও হয়। তবে এসব তুচ্ছ ব্যাপার। মেয়ে বলে খালি ভয় পেয়ে বসে থাকতে হবে নাকি?!"
"আচ্ছা, কিন্তু এই বন্ধুরা তো সবাই পথেই দেখা, আবার যে যার নিজের পথে চলে যাবে, না?"
"হ্যাঁ, আমি সেটাই prefer করি।"
"কিন্তু এ ভাবে কি সত্যিকারের বন্ধুত্ব হওয়া সম্ভব? আসলে আমার মনে হয় এয় ধরনের ভবঘুরে লাইফস্টাইল টা একরকমের দায়িত্ব এড়াতে চাওইয়া, তাই না?"
"তোমার থেকে আমি কম দায়ীত্ব নিই এরম ধরে নিচ্ছ কি করে?! Yes I am a bit confused but that's ok. I love this life - moving on all the time, to new places and people!" মেঘনা একটু বেশিই জোর দিয়ে বলল কি কথাগুল?
"Yes it's ok to be confused. We are still young." জয়ন্ত আর কিছু বলবার মত না পেয়ে চোখ ক্যামেরায়ে লাগালো।

তখন সুর্য্য পাটে নামছে। পাহাড়ের গায়ে যেন কে লালচে সোনা রঙ ঢেলে দিয়েছে। অন্য ট্যুরিস্ট রা আগেই নেমে গেছে। পাহাড়ের মাথায়ে শুধু ওরা দুজন\ মেঘনা দূরে তাকিয়ে আছে। ও কি ভাবছে এখন? ওর জীবনের অনিশ্চয়তার কথা? না কি শুধু সূর্য্যাস্ত উপভোগ করছে? এরম পরিবেশে রোম্যান্স নভেলের নায়করা নায়িকাদের তাদের মনের কথা বলে ফেলে। কিন্তু জয়ন্ত ক্যামেরা টা ব্যাগে ঢোকাতে ঢোকাতে শুধু বলল, "এবার তাহলে নামা যাক। আমি কালকেই Lima হয়ে States-এ ব্যাক করছি।"

(সমাপ্ত)

3 comments:

sisters of mercy said...

বাহ বেশ বেশ। এইটা পড়া যাচ্ছে। ‌চলুক গল্প। :-)

sisters of mercy said...

সব চরিত্র কাল্পনিক? ;)
ভাল হয়েছে। খুব ভাল। তবে পেরু শুধু নেপথ্যেই থেকে গেল, জোড়া রামধনুটাও। ;)

cringe-all said...

হ্যাঁ, স্ট্রীক্টলি কাল্পনিক। ;P
আসলে এটা পেরু যাওয়ার আগে লেখা। এখন শুধু ডায়রী থেকে কম্পুতে তুল্‌লাম। :)